ই-পেপার

হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি ও তার শৈল্পিক বাসা

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: November 24, 2021

‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়ুই,
কুঁড়েঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই।
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে’।

কবি রজনী কান্ত সেনের লেখা কবিতাটি ৩য় শ্রেণীর বাংলা পাঠ্য বইয়ে রয়েছে। বর্তমান যুগের শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তকে কবিতা পড়ে বাবুই পাখির শিল্প নিপুণতার কথা জানতে পেলেও বাস্তবে আর দেখা যাচ্ছে না। কেননা বাবুই পাখি ও তার শৈল্পিক বাসা তৈরির নৈসর্গিক দৃশ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। মূলত নগরায়নের যুগে তাল, নারকেল ও খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় আবাস সংকটে পড়েছে বাবুই পাখিরা। প্রকৃতির ভারসাম্য ধরে রাখতে এই শিল্পী পাখি ও তার শিল্প টিকিয়ে রাখা দরকার।

আমতলীসহ দেশের গ্রামীণ জনপদে একসময় তিন প্রজাতির বাবুই পাখি দেখা যেত। এরমধ্যে বাংলা ও দাগি বাবুই এখন বিলুপ্তির পথে, টিকে আছে কিছু দেশিয় প্রজাতীর বাবুই। বাসা তৈরির জন্য বাবুই পাখির পছন্দের তাল, নারিকেল, সুপারি ও খেজুর গাছ। এসব বৃক্ষ উজারের পাশাপাশি কৃষিকাজে কীটনাশকের ব্যবহারের করণে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি।

তালগাছ আর বাবুই পাখির বাসা এ যেন একই বৃন্তে দুটি ফুল। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটিকে নিয়ে ভাবা যায় না। শুধু তালগাছকে নিয়ে ভাবলে, বাবুই পাখির বাসা এমনিতেই যেন চোখে ভেসে আসে। আবার বাবুই পাখি নিয়ে ভাবলে, তাল গাছের ছবি যেন চোখের সামনে চলে আসে। আবহমান কাল থেকেই বাংলার গ্রামাঞ্চলের মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে এরা।

অথচ এখন আর তেমন চোখে পড়ে না এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তালগাছ আর নিপুণ কারিগর বাবুই পাখির বাসা। কালের আবর্তনে আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সেই তালগাছ আর বাবুই পাখির বাসা- দুই-ই যেন হারাতে বসেছি। তালগাছ আর বাবুই পাখির বাসা নিয়ে পাঠ্যপুস্তকে কতই-না কবিতা রয়েছে। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তালগাছকে নিয়ে লিখেছেন,

“তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে,
সবগাছ ছাড়িয়ে,
উঁকি মারে আকাশে।
মনে স্বাদ,
কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়,
একেবারে উড়ে যায়;
কোথা পাবে পাখা সে?”

কবি রজনী কান্ত সেনের লেখা কবিতার মতই কবি গুরুর লেখা কবিতা বইয়ের পাথায় থেকে গেলেও বাস্তবে কবিতার ‘বাবুই পাখি আর তালগাছ’ নেই বললেই চলে।

একসময় দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে সারি সারি উঁচু তালগাছ দেখা যেত। আর সেই তালগাছের পাতায় পাতায় দেখা যেত বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা। যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে আরো ফুটিয়ে তুলতো। দেখে মনে হতো তাল গাছ যেন তার কানে দুল পরে আছে। কিন্তু এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। কালের বিবর্তনে ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে সেই দৃষ্টিনন্দন পাখি, তার বাসা, বাসা তৈরির নৈসর্গিক দৃশ্য ও গ্রামের ঐহিত্যবাহী তালগাছ এ দুটোই আজ বিলুপ্তির পথে।

বরগুনার আমতলী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ১৪-১৫ বছর আগেও গ্রামের রাস্তা-ঘাট, পুকুরপাড় ও মাঠের মধ্যে সারিসারি তালগাছ ছিল। আষাঢ় মাস আসার আগে থেকেই বাবুই পাখি বাসা বুনতে শুরু করতো। তালগাছের পাতায় পাতায় মোড়ানো বাবুই পাখির বাসার পাশাপাশি পাখিদের কিচির-মিচির শব্দে গ্রামাঞ্চল মুখরিত থাকতো। সেই তালগাছ এখন দেখা যাচ্ছে না। নেই বাবুই পাখির বাসাও। হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি তালগাছ চোখে পড়লেও এখন আর মুখরিত হয়না পাখিদের কিচির-মিচির শব্দে গ্রামবাংলার জনপদ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, কীটনাশকের অপব্যবহার, শিকারিদের দৌরাত্ম, অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ, মানববসতি বাড়ায় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে তালগাছ ও বাবুই পাখি বিলুপ্ত হতে বসেছে। তবে সম্প্রতি বরগুনার আমতলী উপজেলার পাকা সড়ক ও গ্রাম অঞ্চলের পাশে একটি তালগাছে ৫০-৬০টি বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা দেখা গেছে। যা একনজর দেখতে পথচারী ও শিক্ষার্থীরা একটু হলেও থমকে দাঁড়ায়।

প্রাণিবিদরা মনে করেন, আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক প্রকৃতির সুন্দর সৃষ্টি বাবুই পাখি টিকিয়ে রাখা জরুরি। এজন্য বেশি করে তাল, খেজুর ও নারকেল গাছ রোপণ করতে হবে। সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া না হলে বাবুই পাখির বাসা তৈরির গল্প শুধু বই-পুস্তকেই থেকে যাবে।

আমতলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মো. আবু সাইদ বলেন, সকল বন্যপ্রাণিই একটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বাস করে থাকে। মানুষের কোলাহল থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করে। জলবায়ু পরিবর্তন ও জনবসতি বাড়ায় গ্রামাঞ্চলে বড়বড় গাছপালাসহ জঙ্গল কেটে অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে বাবুই পাখিসহ সকল শ্রেণির বন্যপ্রাণির নিরাপদ আশ্রয়স্থল নষ্ট হচ্ছে। একারণেই মূলত গাছ ও বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন