ই-পেপার

সিডরের ১৪ বছর: দুর্ভোগে এখনো উপকূলবাসী

বিএসএল নিউজ ডেস্ক: | আপডেট: November 15, 2021

প্রাকৃতিক দুর্যোগ সুপার সাইক্লোন সিডরের পর উপকূলবাসীর দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের ৯৫ ভাগ কাজ শেষ হলেও নদীভাঙনের ফলে আতঙ্ক কাটছে না সেখানকার বাসিন্দাদের। নদীশাসন করে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও উপকূলবাসী। পর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় ঝড় জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর এই দিনে সুপার সাইক্লোন সিডরের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় বাগেরহাটসহ উপকূলীয় কয়েকটি জেলা। সরকারি হিসেবে এই দিনে প্রায় ৯০৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সিডরের আঘাতে। আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল কয়েকশ কোটি টাকার। স্বজন হারানো বেদনা ও আর্থিক ক্ষতি ভুলে শরণখোলা-মোরেলগঞ্জবাসীর একমাত্র দাবি ছিল টেকসই বেড়িবাঁধ।

গণমানুষের দাবির প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সরকার ২০১৫ সালে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প (সিইআইপি) নামে একটি প্রকল্পের অধীনে মোরেলগঞ্জ থেকে শরণখোলা উপজেলার বগী-গাবতলা পর্যন্ত ৬২ কিলোমিটার টেকসই বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। বেড়িবাঁধের প্রায় ৫৮ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হলেও অরক্ষিত রয়েগেছে সাউথখালী ইউনিয়নের গাবতলা আশার আলো মসজিদ থেকে বগী, তেরাবাকা-শরণখোলা পর্যন্ত চার কিলোমিটার বাঁধ। এই চার কিলোমিটার বাঁধ এখনো নিচু রয়ে গেছে। এখানে ব্লক দেওয়া শুরু করেনি। এই বাঁধে মাটির পরিবর্তে বালু দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এই চার কিলোমিটার বাঁধ দিয়ে প্রতি বছর কয়েকবার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয় কয়েকটি গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার। অনেক সময় পানিবন্দিও থাকতে হয়।

শরণখোলার সব এলাকায় প্রয়োজনীয় সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রিয়াদুল পঞ্চায়েত বলেন, মূল বাঁধের অনেকাংশ নির্মাণ শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গাবতলা আশার আলো মসজিদ থেকে বগী, তেরাবাকা-শরণখোলা পর্যন্ত চার কিলোমিটার বাঁধ এখনও অরক্ষিত রয়েছে। এই চার কিলোমিটার বাঁধে বালুরও ব্যবহার করছেন ঠিকাদাররা। দুই পাশে মাটি দিয়ে ভেতরে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরছেন তারা। এর ফলে এই বাঁধ খুব বেশি টেকসই হবে। বালু না দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন স্থানীয় এই জনপ্রতিনিধি।

স্থানীয় সিদ্দিক ফকির, সিয়ামসহ কয়েকজন বলেন, সিডরের পর থেকে আমাদের একমাত্র দাবি ছিল টেকসই বেড়িবাঁধ ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ। কিন্তু ১৪ বছরেও আমাদের এখানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ শেষ করতে পারেনি সরকার। কোথায় যাব আমরা প্রতিবছরই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে আমাদের ক্ষতি হয়।

বগী গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলী বলেন, বাঁধ নির্মাণ ঠিকই সরকার শুরু করেছে। কিন্তু যে এলাকা সব থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সেই এলাকা এখনও অরক্ষিত রয়ে গেছে।

উত্তর সাউথখালী এলাকার ইউপি সদস্য আল আমিন খান বলেন, আমার এলাকায় কোনো আশ্রয় কেন্দ্র নেই। অথচ আমার এলাকায়ই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল মানুষের। শুধু উত্তর সাউথখালী নয়, শরণখোলার অনেক এলাকায়ই আশ্রয় কেন্দ্রের সংকট রয়েছে।

এদিকে সম্পন্ন হওয়া বেড়িবাঁধে পর্যাপ্ত স্লুইস গেট না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত না হওয়ায় পানিবন্দি থাকতে হয় কয়েক গ্রামের মানুষের।

দক্ষিণ সাউথখালী এলাকার রবিউল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকায় বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি নামতে না পাড়ায় এক ধরনের বন্দি অবস্থায় রয়েছি আমরা। এই বাঁধে পর্যাপ্ত স্লুইস গেট না থাকায় পানি নামে না। একদিন বৃষ্টি হলে, আমাদের কয়েকদিন ধরে পানিবন্দি থাকতে হয়। আমরা এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ চাই।

শরণখোলা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রায়হান উদ্দিন শান্ত বলেন, সিডর বিধ্বস্ত মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বর্তমান সরকার ব্যাপক কাজ করেছে। এ জন্য আমি সরকারকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু টেকসই বেড়িবাঁধের নামে যে বাঁধ করেছে তা পরিকল্পিত ভাবে হয়নি। পর্যাপ্ত স্লুইস গেট না থাকায় এই এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সম্পন্ন হওয়া বাঁধে আরও স্লুইস নির্মাণ এবং অসম্পন্ন যে বাধ রয়েছে সেই বাঁধ দ্রুত নির্মাণের দাবি জানান এ জন প্রতিনিধি।

এদিকে সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত মোরেলগঞ্জবাসীর দাবি পানগুছি নদীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের। একের পর এক আশ্বাসের পরে বাঁধ নির্মাণ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

সিইআইপি প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, ৩৫/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধ নির্মাণের ৯৫ ভাগ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। বর্তমানে আড়াই কিলোমিটার বেড়িবাঁধের কাজ চলছে। আশা করি আগামী জুন মাসের মধ্যে কাজ সমাপ্ত করতে পারব। তিনি আরও বলেন, নদীশাসনের একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলে নদীশাসনের কাজ শুরু হবে।
মাটির স্থলে বালু দিলে বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই। বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন