ই-পেপার

সংকেতে বন্ধ সমুদ্র যাত্রা, দাম বেড়েছে ইলিশের

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: August 12, 2022

উত্তর বঙ্গোপসাগরে নতুন করে আরেকটি লঘুচাপের আভাস দেখা দিয়েছে। বর্তমান একটি দুর্বল লঘুচাপ উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, যা একদিন আগেও নিম্নচাপে রূপ নিয়েছিল। এখনও এটির প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

গত ৭ আগস্ট থেকে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। এতে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সব নদীর পানি বিদৎসীমার ওপর থেকে প্রবাবিহ হয়েছে।

আর এর ফলে নদী কিংবা সাগরে মাছ ধরার ট্রলার গুলোকে গভীর সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আর বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগর উত্তাল থাকায় জেলেরা ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে পারছেন না। কেউ কেউ দুর্যোগ উপেক্ষা করে সাগরে গেলেও দুর্ঘটনার কবলে পড়ছেন। জানাগেছে যাঁরা বৈরী আবহাওয়া থাকার পরও সাগরে গেছেন, তাঁদের অন্তত পাঁচটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। এখনো ২১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অনেককে মাছ ছাড়াই ঘাটে ফিরতে হয়েছে। এ কারণে বেশির ভাগ ট্রলারই ঘাটে নোঙর করে রাখা হয়েছে।

দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া সমুদ্রে ট্রলার ডুবে নিখোঁ রয়েছেন অনেকে। গত ৯ আগস্ট থেকে সাগরে ৩ নম্বর সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অফিস। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে মৎস্যজীবীদের গভীর সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। আবহাওয়া বেশি খারাপ হওয়ায় শত শত ট্রলার সমুদ্রে রওনা দিলেও মাছ না ধরেই ফিরেছে উপকূলে। ভরা মৌসুমে ইলিশ শিকার করতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন মৎস্যজীবীরা।

এদিকে, নদী ও সমুদ্রে যেতে না পারায় বরিশালের ইলিশের মোকামে মাছের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি বরিশালের পাইকারি বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম। সপ্তাহ ব্যাবধানে প্রতি মন ইলিশে বেড়েছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। ইলিশসহ অন্যান্য মাছের দামও চড়া।

এখন ইলিশ ধরার ভরা মৌসুম চলছে। কিন্তু মৌসুম হলেও চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ নেই ইলিশের। কয়েকদিনের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বরিশালসহ দক্ষিণের সমুদ্রগামী জেলে ও ট্রলারের মালিকেরা। লোকসানের আশঙ্কায় অনেক ট্রলার এখন সাগরে নেওয়া হচ্ছে না। ফলে মাছের সরবরাহ কমছে।

বরিশালের সবচেয়ে বড় ও মাছের পাইকারী বাজার হল পোর্ট রোডের মৎস্য আড়ৎ। পোর্ট রোড বাজারের কোল ঘেঁসেই ট্রলার ভেড়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে। নদী থেকে ধরা মাছ গুলো প্লাস্টিকের ড্রাম ও ছালায় পেঁচিয়ে বাজারে আনা হয়। মাছ গুলো বহন করে পাইকারদের কাছে নিয়ে যায় শ্রমিকরা। এরপর শুরু হয় বেচা কেনার পর্ব। তবে মাছ কম থাকায় বাজারে দেখা যাচ্ছে না তেমন হাঁক ডাক। ব্যাস্ততার সাথে সাথে কমে গেছে শ্রমিকদের মজুরীও।

সাধারনত বর্ষাকালে মাছের সরবরাহ বেশী থাকে। তবে এখন দেখা যাচ্ছে না সে অবস্থা। ইলিশ সহ প্রায় সব ধরনের মাছের দামই চড়া। আকারভেদে প্রতি মন ইলিশে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা বেড়ে ৭০০ হাজার। ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ৫০ হাজার টাকা, ১ কেজির ৬০ হাজার টাকা, ১২০০ গ্রাম ৬৫ হাজার টাকা ও দেড় কেজি পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে জেলেদের জালে ইলিশের পাশাপাশি অন্যান্য মাছেরও দাম বেড়েছে বাজারে। এরমধ্যে চিংড়ি আকারভেদে ২০০ টাকা বেড়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তেলাপিয়া ১০০ থেকে ১৮০ টাকা, রুই ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা, কাতল ৩৫০ টাকা, কোরাল ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

মাছ বিক্রেতারা বলছে, ইলিশের মৌসুম থাকলেও সমুদ্রে নিন্মচাপ থাকার কারনে সাগরে ট্রলার যেতে পারেনি। তার মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের থেকে প্রায় দেরগুন জ্বালানি বেশী খরচ হচ্ছে। এতে অনেক ট্রলার সাগরে যাচ্ছে না যার ফলে বাজারে মাছের সরবরাহ কম দামও চড়া।

এদিকে, মাছ ধরায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা গত ২২ জুলাই মধ্যরাতে উঠে যায়। এর পরের দিন থেকে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছিল। সাগরতীরের বরগুনায় মাইকিং করে রাতেও ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল। মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, জেলেদের জালে আটকে যাওয়া ইলিশের প্রায় অর্ধেকটাই বড় আকারের। গত বছর বড় আকারের ইলিশ ছিল গড়ে ২০ শতাংশের মতো। এতে গতবারের চেয়ে এবার রাজস্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। কিন্তু ৭ আগস্ট থেকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে ইলিশ ধরা বন্ধ হয়ে যায়।

মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ইলিশের মৌসুমে পাথরঘাটা, কলাপাড়া, তালতলীসহ বিভিন্ন ঘাট থেকে পাঁচ থেকে ছয় হাজার ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাছ ধরার কাজে কয়েক লাখ মানুষ জড়িয়ে আছে। ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা বাদে সারা বছরই সমুদ্রে মাছ ধরা হয়। কিন্তু ইলিশ মাছের দেখা মেলে বর্ষাকালে। তাই বর্ষা যত দিন থাকে, মাছ ধরার জন্য গভীর সমুদ্রে মৎস্যজীবীরা যান। এবার মৌসুমের নির্দিষ্ট সময় থেকে ইলিশ ধরা শুরু করার পর কয়েক দিন বেশ ভালোই মাছের দেখা মেলে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, ৭ অগস্ট থেকে আবহাওয়া এত খারাপ যে সাগরে টিকতে না পেরে ঘাটে আশ্রয় নিয়েছেন জেলেরা। সাগরে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এমনিতেই এক-একটি ট্রলার গভীর সমুদ্রে পাঠাতে ১৫ থেকে ১৭ জন শ্রমিকের মজুরি, বরফ, জ্বালানি, জালসহ সব মিলিয়ে লক্ষাধিক টাকা খরচ হয় মালিকের। কিন্তু দিনের পর দিন সমুদ্রে যেতে না পারায় মালিকরা ক্ষতির মুখে। অনেকে বাজার থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ট্রলার সমুদ্রে পাঠান। তাঁরা বেশি বিপদে আছেন।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন