ই-পেপার

শায়লার পাহাড় জয়ে গর্বিত পিরোজপুরবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: November 15, 2021

হিমালয়ের “আইল্যান্ড পিক” এর চূড়ায় দেশের জাতীয় পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি পৌছে ১১ দিনের দুঃসাহসিক পথযাত্রা শেষ করেছেন পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার মেয়ে শায়লা পারভীন বিথি। বাংলাদেশ থেকে ২৫ অক্টোবর শুরু হয় চতুর্থবারের মতো এই পাহাড় জয়ের যাত্রা। ২৮ অক্টোবর ভোরে কাঠমান্ডু থেকে বিমানে করে লুকলা গিয়ে পৌঁছান।

সেখান থেকেই মূলত অভিযাত্রীদের ট্রেকিং শুরু হয়। সেখানে ফাকদিন নামে একটি নামে রাত্রিযাপন শেষে পরদিন পৌঁছান নেপালের বিখ্যাত পাহাড়ি শহর নামচে বাজারে। ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টার দিকে আইল্যান্ড পিকের হাই ক্যাম্পে পৌঁছান শায়লা। সেখান থেকে রাত ২টা ২০ মিনিটে পর্বত চূড়ার দিকে যাত্রা শুরু করে সকালে চূড়ায় পৌছেছেন বলে জানিয়েছেন পর্বত জয়ী শায়লা পারভীন বিথি।

শায়লা আরো জানান, গত সোমবার (০৮ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পর্বতটির চূড়ায় পৌঁছান শায়লা। সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটের দিকে চূড়ায় পৌঁছে যান এবং সেখান থেকে সফলভাবে নেমে আসেন। নেপালের কাঠমান্ডু থেকে রওয়ানা দিয়ে ১১ দিনে হিমালয়ের ছয় হাজার ১৬০ মিটার উঁচু এই পর্বতটি জয় করেন তিনি। এই দুঃসাহসিক পথযাত্রা শেষে তিনি পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি।

এছাড়াও তিনি ধর্ষণ এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী নানা বার্তা সম্বলিত প্লাকার্ডও বহন করেন। এ অভিযানে শায়লা বিথী হিমালয়ের বিখ্যাত ‘থ্রি পাস’ পাড়ি দেন। তিনি গত ২ নভেম্বর রেঞ্জোলা পাস, ৪ নভেম্বর চোলা পাস ও ৬ নভেম্বর কংমালা পাস পাড়ি দেন।

অভিযানে বিথীর সঙ্গে একজন নেপালি শেরপা ও একজন পোর্টার ছিলেন। সর্বশেষ এ অভিযানের তত্ত্বাবধান করছে ঢাকা ট্রাভেল অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। এর আগে শায়লা প্রথম পর্বত জয় করেন ২০১৬ সালে। সে বছর তিনি হিমালয়ের ছয় হাজার ৪৭৪ মিটার উঁচু মেরা পিক জয় করেন। এরপর ২০১৮ সালে তিব্বতের সাত হাজার ৪৫ মিটার উঁচু লাকপারি পর্বত জয় করেন। ২০১৯ সালে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে হিমালয়ের দুর্গম তাশি লাপচা পাস অতিক্রম করেন শায়লা।

শায়লার পরিবার সূত্রে জানা যায়, পিরোজপুর এর নেছারাবাদ উপজেলার সদর ইউনিয়নের মৃত শেখ আবদুস সালামের বড় মেয়ে শায়লা পারভীন বিথি। জন্ম ১৯৯২ সালের ১৬ মার্চ। ২ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে বড় শায়লা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন চঞ্চল স্বভাবের। প্রাথমিক স্তরে স্বরূপকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পরে সরকারি স্বরূপকাঠি পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ধাপ শেষ করেন। এর পরেই তিনি চলে যান ঢাকায় হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষে এখনো চলছে পড়াশোনা।

শায়লার ছোট বোন সামিরা ইয়াসমিন সায়মা জানান, গত বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে যথাক্রমে ছয়, সাত ও আট হাজার মিটারের তিনটি পর্বত অভিযানের ঘোষণা দেন শায়লা আপু। এ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হলো, পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি পৌঁছে দেওয়া। বর্তমানে তিনি কাঠমান্ডুতে রয়েছেন। সেখান থেকে তিনি (১৪ নভেম্বর) ঢাকায় ফিরেন বলে জানিয়েছেন। এর আগেও আপু কয়েকবার পাহাড় জয় করেছেন। আপুর এই দু:সাহসিক সাফল্যে আমি আমার পরিবার ও শিক্ষকরা গর্বিত।

সরকারি স্বরূপকাঠি পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমান জানান, শায়লা ভদ্র একটা মেয়ে। সে যখন আমার বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয় তখন থেকে একটু চঞ্চল প্রকৃতির। আমরা শিক্ষকরা এখন শায়লাকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি। তার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের কোন অভিযোগ বা অসন্তুষ্টি নাই। শায়লা যখন পড়াশোনা করতো তখন আমি বাংলা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলাম। তবে সে এসএসসি পরীক্ষার পরে জেলার বাইরে থাকায় তার সাথে আমাদের তেমন যোগাযোগ ছিল না। তবে সে মেয়ে হয়ে তার এই অর্জনের জন্য আমরা গর্বিত এবং তার আগামীর জন্য অনেক শুভকামনা রইলো।

৩নং স্বরুপকাঠী সদর ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দেব কুমার সমাদ্দার জানান, শায়লা আমার বাড়ির পাশেই থাকে। তাকে ছোট থেকেই আমি চিনি। চঞ্চল প্রকৃতির এই মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার পরে পিরোজপুরে না থাকায় তার সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত কিছু বলতে পারবো না। তবে তার পাহাড় জয়ের বিষয়টি আগেরও শুনেছি এবং সম্প্রতি সে আবারো একটি পাহাড় জয় করেছে। এমন কার্যক্রম আমাদের জন্য গর্বের।

৩নং স্বরুপকাঠী সদর ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি চেয়ারম্যান মো: আল আমিন জানান, নেছারাবাদ উপজেলার সদর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের আব্দুস সালাম ভাইয়ের মেয়ে শায়লা। প্রতিনিয়তই নারীরা এমন অর্জনের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। নারী অগ্রযাত্রার এই ধারাকে আমি স্বাগত জানাই। ফেইজবুকসহ বিভিন্ন স্থানে শায়লার এই বিষয়টি আমি দেখেছি ও স্থানীয় এবং পরিবার সূত্রে শুনেছি। তার এ কার্যক্রমকে আমি আমার ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে স্বাগত জানাই।

নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোশারেফ হোসেন জানান, আমি বিষয়টি সম্পর্কে শুনেছি। শায়লা বিথি আমাদের এই নেছারাবাদ উপজেলার মেয়ে। এখন নারী ক্ষমতায়ন যেভাবে হচ্ছে তাতে নারীরা পিছিয়ে নাই। আগে যে গৃহের মধ্যেই নারী অবদান ও সাফল্য ছিল সেটি বর্তমানে সারা বিশে^ ছড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি জাতীয় পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি পাহাড় জয় করে পৌছেছেন যা মুজিববর্ষে দেশের একটি সাফল্য ও অর্জন।

মুজিবর্ষে পাহাড় জয় করে জাতীয় পতাকা এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি বিভিন্ন দেশের উচ্চ পর্বত শৃঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে পরিচয় করাবেন এমন একটি পরিকল্পনা নিয়েই তিনি এগিয়েছেন বলে আমি জানতে পেরেছি। আমি তার পরিবারের সাথে কথা বলেছি এই মহতি কাজের জন্য।

নারীরা প্রতিনিয়তই একটার পর একটা সাফল্য এনে দিচ্ছেন আমাদের সেক্ষেত্রে নারীদের অগ্রযাত্রা আর কেউ আটকে রাখতে পারবে না বলে আমি বিশ্বাস করি। নারীর এ অদম্য অগ্রযাত্রা সফল হোক। নারী পুরুষ সকলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠন করার লক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে তা আরো তরান্বিত হোক।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন