ই-পেপার

বরিশালের ঐতিহ্য চরকাউয়া খেয়াঘাট এখন দৃষ্টিনন্দন পার্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: April 19, 2022

বরিশাল নগরীর সাথে পূর্বাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম চরকাউয়া খেয়াঘাট। প্রাচীন এই ঘাট থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত। কিন্তু উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মৃত্যুকুপে পরিণত হয় ঐতিবাহী এই ঘাটটি। সেই সাথে দখলদারদের বাডুজ্যিক স্থাপনায় পরিণত হয় যাত্রী ছাউনিটিও।

তবে, ইতিহাসের ঐতিহ্যবাহী চরকাউয়া খেয়াঘাটের পুরো চিত্রই পাল্টে দিয়েছেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। নিজের ব্যক্তিগত অর্থায়নে খেয়াঘাটটি সাজিয়েছেন কোন এক জমিদার বাড়ির পুকুর ঘাটের আদলে। আর ঘাটের উপরাংশ ও যাত্রীছাউনী সাজানো হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির শোভাবর্ধক গাছ, ফ্লোরপার্কিং টাইলস, নানা রঙয়ের আলোকসজ্জায়। বলতে গেলে অবহেলিত চরকাউয়া খেয়াঘাটটি এখন শুধু খেয়া পাড়াপারেরই স্থান নয়, এটি এখন পরিণত হয়েছে দৃষ্টি নন্দন এক বিনোদন কেন্দ্রে। আর এ-নিয়ে জনমতের প্রসংশায় ভাসছেন সিটি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ‘চরকাউয়া খেয়াঘাটের রাস্তা থেকে ঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। খেয়াঘাটে ট্রলার বা নৌকা থামানোর জন্য নতুন করে সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। গাড়ি উঠা-নামার জন্য সিঁড়ির পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে পৃথক র‌্যাম্প। এছাড়া যাত্রীছাউনিটিও এরই মধ্যে মানুষের বসা এবং দুদণ্ড শান্তির বিশ্রামের জন্য উপযুক্ত করে তোলা হয়েছে। ছাউনির চারপাশে টাইলস, আলোকসজ্জা এবং বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছাউনির দুইপাশে এবং খেয়াঘাটের মাঝ বরাবর ফুলেরবাগান করা হয়েছে। ফুলেরবাগানে লাগানো হয়েছে, ‘শোভাবর্ধক পাম্প ও ঝাউ গাছ, হাসনাহেনা, এবং বেলীসহ দেশী-বিদেশী অন্তত ৫০ প্রজাতির ফুলগাছ। যা খেয়াঘাটটিকে ছোটখাট একটি গার্ডেনে রূপ দিয়েছে।

চরকাউয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং একই এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহীন হাওলাদার বলেন, ‘বরিশালের পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দারা চরকাউয়া খেয়া পারাপারের মাধ্যমে নগরীতে প্রবেশ করেন। প্রতিদিন প্রায় অর্ধলাখের মত মানুষ চরকাউয়া থেকে খেয়া পারাপার হয়ে নিজ নিজ গন্তবে যাত্রা করেন।
খেয়াঘাটের মাঝি সুমন বলেন, ‘জনসাধারণের বিশাল একটি অংশ এই পথে যাতায়াত করেন। অথচ দীর্ঘদিন যাবৎ খেয়াঘাটটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থেকে যায়। উন্নয়ন অবহেলার কারণে মানুষের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে দাঁড়ায় ঘাটটি। মাঝে মধ্যে দু-একটি দুর্ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু ইজারা না থাকায় ঘাটটির উন্নয়নে এগিয়ে আসেনি বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ‘চরকাউয়া খেয়াঘাটটি নদী বন্দরের অধিনে। ইতিপূর্বে এ ঘাটে চলাচলে ইজারা এবং টোল প্রথা চালু ছিলো। কিন্তু বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরন চরকাউয়া খেয়াঘাটটি টোল মুক্ত করে দেন। এরপর থেকে চরকাউয়া খেয়াঘাটের উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখছে না বিআইডব্লিউটিএ। এ কারণেই খেয়াঘাটটি মানুষের উপকারের থেকে ক্ষতির বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এদিকে, খেয়াঘাটে দুর্দশার চিত্র গণমাধ্যমে উঠে আসলে চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে, হঠাৎ করেই চরকাউয়া ঘাটটি পরিদর্শনে যান বরিশাল সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। এসময় তিনি বরিশালের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য রক্ষায় নিজ অর্থায়নে চরকাউয়া ঘাটের উন্নয়ন এবং সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেন। যেই কথা সেই কাজ। কিছুদিন না যেতেই অর্থাৎ ১-মার্চ শুরু হয় খেয়াঘাটের উন্নয়ন, সংরক্ষণ এবং সংস্কারের কাজ।

খেয়াঘাটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সোহেল বলেন, ‘সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘাটের যাত্রী ছাউনিটিও কতিপয়ের বেদখলে চলে যায়। স্থানীয় কিছু লোক ছাউনির সামনের অংশ বিভিন্ন ফল ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়ে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে আসছিলো। আবার ভ্রাম্যমান হকার এবং মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন হালকা বাহন ঘাটের জায়গা দখল করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। এতে যাত্রীদের ওঠা-নামায় খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন এবং সংস্কারের কারণে খেয়াঘাটের অভ্যন্তরে এখন আর মোটরসাইকেল বা রিকশা পার্কিং হয়না। যাত্রীছাউনিও দখল মুক্ত হয়েছে। সেখানে মানুষের বিশ্রামের ব্যবস্থা হয়েছে। নদীর তীরে কিছুটা ভাসমান ওয়ার্কওয়ের কারণে মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করতে পারছে। মেয়রের উন্নয়নের কারণে অবহেলিত খেয়াঘাটটি এখন দৃষ্টিনন্দন মিনি পার্কে পরিণত হয়েছে বলে আনন্দিত খেয়াঘাট সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ের মানুষ।

এ প্রসঙ্গে চরকাউয়া খেয়াঘাটের পুনঃনির্মাণ ও সৌন্দর্য বর্ধন কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার বরিশাল সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান সুজন বলেন, ‘খেয়াঘাটে সিঁড়ির কাছে একটি গেট নির্মাণ করা হয়েছে। গেটের দুই পাশে মার্বেল পাথর দিয়ে বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রীর মুর‌্যাল তৈরি করা হবে। এছাড়া চরকাউয়া খেয়াঘাটটি যেহেতু ঐতিহ্যবাহী একটি ঘাট সেজন্য গেটের উপর অংশে একটি নৌকা নির্মাণ করা হচ্ছে। আর যাত্রী ছাউনিটির নাম ‘চরকাউয়া যাত্রী ছাউনিই’ রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘ঘাটটি নিয়ে আইনী জটিলতার কারণে উন্নয়ন হচ্ছে না। কিন্তু জনগণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে মেয়র মহোদয় তাঁর নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে চরকাউয়া খেয়াঘাটটির আধুনিকায়ন করা হয়েছে। পুরো কাজ শেষ করতে প্রায় ৯০ লাখ টাকার মত ব্যায় হতে পারে। পুরো টাকাই মেয়র মহোদয় নিজেই দিচ্ছেন।

ছাত্রলীগ নেতা সুজন আরও বলেন, ‘অনেকেই বলেছিলেন ঘাটে নির্মিত তোড়ন এবং যাত্রীছাউনিটি মেয়র মহোদয়ের মা সাহান আরা বেগম এর নামে করার জন্য। কিন্তু মেয়র মহোদয় তাতে রাজি হননি। তিনি বরিশালের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বিবেচনা বশত: তিনি ঘাটের নাম পরিবর্তন না করে চরকাউয়া খেয়াঘাট নামটিই সংরক্ষণ করেছেন।

আশিকুর রহমান সুজন এও বলেন, ‘ঘাটের উন্নয়ন কাজ শেষ পর্যায়। এখন ফিনিসিংয়ের কাজ চলছে। ঈদের আগেই অর্থাৎ আগামী ২৪ অথবা ২৫ রমজানে ঘাটটি মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আশা করা যায়, সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ঘাটটির আনুষ্ঠানিকভাবে অচিরেই উদ্বোধন করবেন।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন