ই-পেপার

বরিশালের ৭ খালের ভবিষ্যত এখন পানিউন্নয়ন বোর্ডে

খান রুবেল | আপডেট: November 22, 2021

‘ধান-নদী-খাল’ এই তিনে বরিশাল। তিনটি প্রাচিন ঐতিহ্য এখন স্লোগানেই সীমাবদ্ধ। কেননা ধান-নদী থাকলেও অস্তিত্ব সংকটে খালগুলো। দখল দূষণ আর অপরিকল্পিত উন্নয়ণের কারণে একে একে মৃত্যু হচ্ছে খালগুলোর। এর ফলে নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা অন্যতম সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।

এদিকে, দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে থাকা ২২টি খাল পুনরুদ্ধারে জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ্য থেকে একাধিক উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবাছু প্রশ্নবৃদ্ধ হয়ে আছে। তবে এবার ধান-নদীর পাশাপাশি যৌলস হারাতে বসা খালগুলোর অস্তিত্ব পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এরি মধ্যে সিটি কর্পোরেশন এলাকার সাতটি খাল উদ্ধার এবং খনন প্রকল্প গ্রহণ করেছে দপ্তরটি। যা বর্তমানে প্লানিং কমিশন হয়ে একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

প্রায় ১৩ কোটি ১৫ লক্ষ টাকার এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার খাল খনন, সৌন্দর্য বর্ধণ, ওয়াকওয়ে এবং বৃক্ষরোপন করা হবে। থাকবে খালের প্রবেশ দ্বারে গেট পাশের ব্যবস্থা। তাই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ৭টি খাল যেমন পুনরুদ্ধার হবে, তেমনি জলাবদ্ধতার সীমাহীন দুর্ভোগ থেকে নিস্তার মিলবে নগরবাসীর। তাই নগরীর সাতটি খালের ভাগ্য এখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাতে বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন মহল।

জানা গেছে, একসময় বরিশাল নগরীর চারদিক থেকে বেয়ে যায় ২২টি খাল। প্রতিটি খালই কীর্তনখোলা নদীর সাথে সংযুক্ত। একসময় এসব খাল দিয়ে চলাচল করতো গয়নার নৌকা। বরিশাল শহরের ব্যবসায়ীক কেন্দ্রবিন্দু ছিলো ঘালগুলোকে ঘিরে। তবে সেই খালগুলো দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। খালের দুই তীরে গড়ে উঠেছে পাকা স্থাপনা। অনেকেই আবার দখল করেছেন খালের অংশ। বিভিন্ন মালিকানাধিন ভবনের পয়নিষ্কাশনের পাইপ লাইন দেয়া হয়েছে খালগুলোর সাথে। ফলে ময়না আবর্জনার স্তুপ পড়ে গেছে খালগুলোতে। এর পাশ দিয়ে চলাচল করতে গেলে পথচারীদের মুখে রুমাল ধরতে হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ‘কীর্তনখোলা নদীর ডিসি ঘাট থেকে ভাটারখালটি জিলা স্কুলের কোল ঘেষে বটতলার নবগ্রাম খালের সঙ্গে মিলেছে। ২০১০ সালে সার্কিট হাউজের পেছনে ভাটারখালের অংশ ভরাট করে সড়ক নির্মাণ করে সিটি কর্পোরেশন। এর ফলে ওই খাল দিয়ে পানি প্রবাহ দূরের কথা এখন বর্ষা মৌসুম বা নদীর জোয়ার এলে খালের ওপরে সড়কটিও তলিয়ে যাচ্ছে।

অপরদিকে, ‘২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে নগরীর ২২টি খাল দখলমুক্ত, পরিচ্ছন্নতা ও চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। ওইসময় সর্বস্তরের মানুষের সতস্ফুর্ত অংশগ্রহণে জেলখাল উদ্ধারে অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশন। পরবর্তীতে সীমানা নির্ধারণ করে নামসহ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়া হয় খালগুলোতে। ওইসময় দখল মুক্ত’র পাশাপাশি খালগুলো দূষণমুক্ত রাখতে অঙ্গীকার করেছিলেন ভবন মালিকরা। কিন্তু তারা সেই কথা রাখেননি।

অপরদিকে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ্য থেকে খালগুলো পুনরুদ্ধার এবং সৌন্দর্য বর্ধণসহ আনুসাঙ্গিক উন্নয়নে দুই হাজার ৬৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেন। যা প্রস্তাবনা আকারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই প্রকল্প এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তাই সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ’র উদ্যোগে গত বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নগরীর খালগুলো পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু করা হয়। তবে বর্তমানে সেই কার্যক্রম এখন আর দৃশ্যমান নেই।

যদিও বিদেশী সংস্থার সহায়তায় নগরীর সাগরদী খাল উদ্ধার এবং সৌন্দর্য বর্ধণে একটি প্রকল্প রয়েছে সিটি কর্পোরেশনের। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পটি অনেক দূর এগিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে দরপত্র কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্র। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কীর্তনখোলা নদী থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার খাল খনন, সংরক্ষণ, সৌন্দর্য বর্ধণ, ওয়ার্কওয়ে এবং ট্রি প্লান্টেশন করা হবে।

এর আগে ২০১০ সালে নগরীর খালগুলোর সীমানা নির্ধারণ ও সংরক্ষণের জন্য আদালতে মামলা করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। সেই মামলা এখনো চলছে। তবে মামলার নিস্পত্তি বা লক্ষ্যপূরণ নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যেই বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন খালগুলোর মধ্যে সাতটি খাল খননসহ সংরক্ষণে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

গত বছর সাংবাদিকদের সাথে এক সৌজন্য স্বাক্ষাতে বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম জানিয়েছিলেন, সিটি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ’র অনুরোধে সাতটি খাল সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি আশ্বস্থ করেছিলেন গেলো বর্ষা মৌসুমের আগেই সংস্কার কাজ সম্পন্ন হবে। কেননা খালগুলো সংরক্ষণে একনেকে অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। প্লানিং মন্ত্রণালয় থেকেই অনুমোদন করা যাবে। তবে সেই প্রতিশ্রæতি পেরিয়ে গেলেও খালগুলো উদ্ধার কার্যক্রম এখনো দৃশ্যমান হয়নি।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড পওর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস জানিয়েছেন, সারাদেশে বেশ কিছু খাল উদ্ধার এবং সংরক্ষণে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যা ‘৬৪ জেলায় ছোট নদী-খাল ও জলাশয় পুন খনন প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের আওতাভুক্ত’ প্রকল্প। প্রকল্পটি এখন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধিন এককেনে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় নগরীর আমানতগঞ্জ খালের ৩ কিলোমিটার, পলাশপুর খাল ১ দশমিক ৭ কিলোমিটার, ঐতিহ্যবাহী জেল খালের ২ দশমিক ০৩৫ কিলোমিটার, ভাটারখালের ১৮০ মিটার, চাঁদমারী ও শাখা খালের ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার, সাগরদী খালের ৯ কিলোমিটার ও রূপাতলী খালটির ১১শ মিটার খনন এবং সংরক্ষণ করা হবে। এ প্রকল্পের আওতায় শুধু খননই নয়, খালের তীরে ওয়ার্কওয়ে, বিক্ষরোপন এবং খালের প্রবেশদ্বারে বোর্ড পাশের ব্যবস্থা থাকবে।

নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘সাগরদী খাল সংরক্ষণে সিটি কর্পোরেশন থেকে একটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে বলে শুনেছি। সেটা হয়ে গেলে আমরা সিটি কর্পোরেশনকে ছেড়ে বাকি অংশের কাজ করবো। কাজ যারাই করুক, আমরা চাই নগরীর ঐতিহ্যবাহী খালগুলো উদ্ধার এবং সংরক্ষণ হোক।

তিনি বলেন, ‘পূর্বে খাল খকনের এই প্রকল্প আলাদাভাবে নেয়া হয়েছিল। সেভাবে করলে এককেনের অপেক্ষায় থাকতে হতো না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনেই করা যেতো। কিন্তু সেটা অনেক সময়ের ব্যাপার। তাই দেশব্যাপী যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সেই প্রকল্পের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বরিশালের খাল খনন প্রকল্পকে। এ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী এবং সচিব মহোদয় ব্যক্তিগতভাবে কাজ করছেন। আমরা আশাকরছি একনেকের অনুমোদন এবং প্রকল্পটি বাস্তবাছু হলে বরিশালের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধান-নদী-খাল আবার বাস্তবে রূপ নিবে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন