ই-পেপার

দখল-দূষণে বিপন্ন কীর্তনখোলা নদী

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: May 24, 2022

বরিশালের বিভিন্ন নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে যৌথ জরিপের কার্যক্রম তিন বছরেও সম্পন্ন না হওয়ায় দখলদাররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কীর্তনখোলা নদীর উভয় তীরে প্রভাবশালী মহল বৃহৎ প্রতিষ্ঠান গড়ে দখলদারী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ফলে নদী সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি দূষণের কবলে পড়ে বিপন্ন হতে চলেছে। দখলদারদের উচ্ছেদে বিআইডব্লিউটিএ, জেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর বারবার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬০ সালে বরিশাল নদীবন্দর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কীর্তনখোলা নদীর পানির সীমানা থেকে স্থলভাগের দিকে জমির ৫০ ফুট পর্যন্ত বিআইডব্লিউটির আওতায় থাকার কথা। সে অনুযায়ী নৌবন্দরের উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৩৭ একর জমি বিআইডব্লিউটির। তবে ঐ জমিতে সীমানাপ্রাচীর না থাকায় বিভিন্ন সময়ে ভূমিখেকোরা এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালীরা সেখানে গড়ে তুলেছে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বসতঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

বিআইডব্লিউটির কর্মকর্তারা জানান, সীমানা চূড়ান্তকরণ বা পুনর্র্নিধারণের আগে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ২০১৬ সালে তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী জেলা প্রশাসনকে ছয় মাসের মধ্যে সীমানা চূড়ান্ত করে করে বিআইডব্লিউটির জমি বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সীমানা চূড়ান্তকরণ কার্যক্রমের কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিআইডব্লিউটির হিসাবে, তাদের জমির মধ্যে প্রায় আট একর বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৩০৬ জন মিলে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে।

বিআইডব্লিউটির নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক ও বরিশাল বন্দর কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ২০১৯ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন বরিশাল জেলা প্রশাসক জেলার বিভিন্ন নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের জন্য যৌথ জরিপ করে সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করে। কিন্তু করোনার প্রভাব ও দক্ষ জনবলসংকট থাকায় এ কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।

গত সোমবার বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরে বিআইডব্লিউটির মেরিন ওয়ার্কশপ চত্বরে নবনির্মিত ড্রেজার বেজ ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি তার বক্তৃতায় বলেছেন, নদী রক্ষায় বিআইডব্লিউটিএ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অল্প দিনের মধ্যে নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানকে বরিশালে পাঠানো হবে। কীর্তনখোলা নদীসহ যেসব নদী দখল ও দূষিত হয়ে গেছে, সেসব নদীগুলো চিহ্নিত করা হবে। তিনি বলেন, নদীকে শাসন করা যাবে না, নদীকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে যে ফোরশোর (নদীর লো ওয়াটার এবং হাই ওয়াটার লেভেলের মাঝ থেকে ৫০ ফিট নদীর পার পর্যন্ত) রয়েছে তার শতকরা ৩০ ভাগও বিআইডব্লিউটির নিয়ন্ত্রণে নেই। এই ভূমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে-বেনামে বিভিন্ন মহল থেকে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভোগদখল করে আছে। এসব ভূমিদস্যু অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন কারখানা তৈরি করে তার বর্জ্য ফেলে কীর্তনখোলা নদীর পানি দূষিত করছে।

নগরীর অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ওষুধ কারখানা, প্লাস্টিক কারখানার বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে নদীতে। নদীতীরে গড়ে ওঠা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, তেল ডিপো, মৎস্য ও কাঁচাবাজারের বর্জ্য কীর্তনখোলার পানি দূষিত করে তুলছে। ঢাকা-বরিশাল রুটসহ অভ্যন্তরীণ রুটের লঞ্চগুলো বরিশাল নৌবন্দরে নোঙর করে ধোয়ামোছা থেকে শুরু করে লঞ্চের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা ফেলছে কীর্তনখোলার পানিতে। ফলে পানির সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নৌবন্দর এলাকার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম জানান, কীর্তনখোলা নদীর আদি রূপরেখা তথা সিএস মৌজা ম্যাপ অনুসরণ করে এর প্রকৃত সীমানা অতি দ্রুত নির্ধারণ করে স্থায়ী পিলার স্নাপন করতে হবে। নদীর তীর সীমানায় অবৈধ দখলদারদের স্থায়ীভাবে উচ্ছেদসহ নদী ড্রেজিং করার সময় যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন